চট্টগ্রাম বন্দরে ৮.৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি, সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ১০০ কোটি টাকা
ছবি- সংগৃহীত
পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের বিভিন্ন ভবন ও শেডের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগিয়ে ৮.৪২ মেগাওয়াট-পিক (MWp) ক্ষমতার রুফটপ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের (জিজিআই) সঙ্গে চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে আগামী ২০ বছরে বিদ্যুৎ ব্যয় বাবদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জিজিআইয়ের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বন্দরের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। অন্যদিকে জিজিআইয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ নূরে আলম।
প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বেসরকারি বিনিয়োগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে অপারেটিং এক্সপেনডিচার বা ওপেক্স (OpEx) মডেল অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক মূলধনি বিনিয়োগ করতে হবে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে; জিজিআই নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করবে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর টানা ২০ বছর চট্টগ্রাম বন্দরকে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করবে জিজিআই। প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থাপন, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও থাকবে প্রতিষ্ঠানটির ওপর।
অন্যদিকে, চুক্তিতে নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে বন্দরের দৈনন্দিন বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি গ্রিডের ওপর চাপ হ্রাস
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে আগামী দুই দশকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি এটি বন্দরের পরিচালন ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমানো। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বন্দরের বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে প্রযোজ্য নিয়ম ও ব্যবস্থার আওতায় নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও থাকবে।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো গেলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সে বিবেচনায় প্রকল্পটি চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যগুলোর আলোকে এ ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্ধারিত শর্ত ও যাচাইপ্রক্রিয়া পূরণ সাপেক্ষে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
‘গ্রিন পোর্ট’ গড়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দর
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালন কার্যক্রমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত—উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর মাধ্যমে বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিবেশসম্মত বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার পথে চট্টগ্রাম বন্দর আরও এগিয়ে যাবে।
তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পরিমাণ এবং জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিধি নির্ভর করবে বাস্তব উৎপাদন, বিদ্যুতের ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার ওপর।