‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার

অনলাইন ডেস্ক
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৯ অপরাহ্ন

জাতীয়

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার কথা জানিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অন্য কোনো দেশের সরকার বা জনগণের স্বার্থের আগে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই এ নীতির মূল কথা। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের কূটনীতির লক্ষ্য।

শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব রয়েছে। ওই নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের লক্ষ্য

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের সদস্যদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় সরকার।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই এর উদ্দেশ্য।

অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ, উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগে সেটি দেশের জন্য কী ধরনের সুবিধা বয়ে আনবে, তা বিবেচনা করা হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ, ব্রিকস, সার্ক ও বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণকে তিনি পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখেন না।

বন্ধু চাই, প্রভু নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর মতে, অতীতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে, যা কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। বিশেষ করে ট্রানজিট সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত—‘বন্ধু চাই, প্রভু নয়’। তাঁর মতে, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে তিনি ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তবে অর্থনৈতিক চুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের শাকসবজি ও মাছের মতো পণ্যের জন্য নতুন বিদেশি বাজার খুঁজে বের করার সুযোগ রয়েছে।

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার গুরুত্ব

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির দক্ষতার ওপর।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেন, স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি, কার্যকর সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনীতি প্রয়োজন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং জাতীয় প্রয়োজনের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সামলাতে আবেগের পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোন দেশের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সার্ক পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করাকে সরকারের আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানান, সার্ককে কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শামা ওবায়েদ বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্ক এবং বিমসটেক—দুটি সংস্থাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা, অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য তুলে ধরেছে সরকার। তবে এ নীতির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।