ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা, বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

অনলাইন ডেক্স:
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা, বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি ছবি- সংগৃহীত

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সহিংসতার পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ ও জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে দেশটির সরকার।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানান, সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে—এমন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত পুরো প্যারিসে কারফিউ জারির পরিকল্পনা নেই। পরিস্থিতির অবনতি হলে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল এলাকার আশপাশে রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের লিল, দোয়ে, ওয়াতিনিয়ে ও দেন্যাঁ শহরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাতের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দক্ষিণের মার্সেই শহরেও জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত ১৭ অক্টোবর শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, জনসেবার সংকট ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এতে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে বলা হয়েছে, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন বিক্ষোভকারীর হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী।

মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হয়। মার্সেইয়ে পৌর ভবনেও হামলার ঘটনা ঘটে। প্যারিসের অভিজাত প্লাস ভঁদোম এলাকায় বিলাসপণ্যের একাধিক দোকানের সামনের অংশ ও কাচ ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের প্রতিনিধিদের হিসাবে, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও কর্মীদের সহায়তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানান, মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সহিংসতার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রনের সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি ম্যাক্রন। বরং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনা, পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু সহিংসতার পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার অভিযোগ তুলেছেন। তবে বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দাবি করেছেন। সরকার বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বজায় রেখেই লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সহিংসতার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পর্যটন খাতেও। ১৯ অক্টোবর প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট, ভাঙচুরের চিহ্ন ও পোড়া গাড়ি দেখা যায়। কয়েকটি পর্যটনস্থলে প্রবেশে বিঘ্ন ঘটায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তি হয়। পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশি পর্যটকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে আগামী শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আয়োজকেরা। ফলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের কথা জানিয়েছে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন।

২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি ম্যাক্রনের সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জননিরাপত্তা ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষের মধ্যে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।