ভোট দেয় কয়রার বনজীবীরা, বদলায় না জীবন
খুলনা ব্যুরো :
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার বনজীবী জেলেদের কাছে ভোট একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা হলেও জীবনের বাস্তবতা বদলায় না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। নিয়ম মেনে ভোট দিলেও নির্বাচন শেষে নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও জীবিকা–সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
কয়রার আমাদী, মহারাজপুর, দক্ষিণ ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে সুন্দরবননির্ভর হাজার হাজার বনজীবী জেলে বসবাস করেন। মধু সংগ্রহ, কাঁকড়া ও মাছ ধরাই তাঁদের প্রধান জীবিকা। ভোটের সময় প্রার্থীরা নানা আশ্বাস দিলেও ভোট শেষে সেগুলোর প্রতিফলন দেখা যায় না বলে অভিযোগ তাঁদের।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বনজীবী বিশ্বজিৎ কয়াল (৫৮) বলেন, ভোটের আগে নেতাদের কথা মধুর মতো শোনালেও পরে আর খোঁজ থাকে না। বনে গিয়ে আগের মতোই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিবছর সুন্দরবনে কাজ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণ, ডাকাতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু বনজীবী আহত বা নিহত হন। তবে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পেতে দীর্ঘ ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে।
মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আঃ রহিম গাজী বলেন, ভোটের দিন কেন্দ্রে নিরাপত্তা থাকলেও বনে গেলে তাঁদের জন্য কোনো নিরাপত্তা নেই। ভোট গ্রহণের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়—এমনটাই তাঁদের অভিজ্ঞতা।
নারী ও শিশুরা এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। দক্ষিণ বেদকাশীর গৃহবধূ ফিরোজা বিবি বলেন, স্বামী বনে গেলে উৎকণ্ঠায় দিন কাটে। নদী শান্ত থাকলেও মনে শান্তি থাকে না।
এদিকে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এদের বড় অংশই সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষ। আসন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা এলাকায় প্রচার চালিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার, সুপেয় পানি, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তবে স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বারবার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাকই বনজীবীদের হতাশার মূল কারণ। তাঁদের মতে, জীবন ও দুর্ঘটনা বিমা, দ্রুত ক্ষতিপূরণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকলে বনজীবীদের কাছে ভোট কেবল একটি দিনের দায়িত্ব হয়েই থাকবে।
তবু পুরোপুরি আশাহীন নন সবাই। তরুণ বনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, হয়তো একদিন এমন নেতৃত্ব আসবে, যারা সত্যিই তাঁদের কথা ভাববে—সেই আশাতেই এখনো ভোট দেন তাঁরা।
কয়রার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—ভোট যেন শান্তিপূর্ণ ও ভয়হীন হয়, আর নির্বাচনের পর তাঁদের কথা যেন ভুলে না যান জনপ্রতিনিধিরা