সাংবাদিকতার পরিচয় কি এতটাই সহজ? সাংবাদিকতার শক্তি কার্ডে নয়, কলমে
মাসুদ আল হাসান, খুলনা ব্যুরো :
আজকাল “আমি সাংবাদিক”—এই বাক্যটি উচ্চারণ করলেই যেন অনেক দরজা খুলে যায়। অথচ প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতা কি শুধু একটি পরিচয়, নাকি একটি দায়িত্ববোধের নাম? যদি দায়িত্বই মুখ্য হয়, তাহলে সেই দায়িত্ব পালনের ন্যূনতম যোগ্যতা ও নৈতিকতা কোথায় দাঁড়ায়?
ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের বিস্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে। নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল, অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক পেজ কিংবা ভিজিটিং কার্ডসর্বস্ব পরিচয়ের আড়ালে যারা সাংবাদিকতা করছেন বলে দাবি করেন, তাদের কার্যকলাপ অনেক সময়ই পেশাটির মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে নির্বাচন কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমকে ঘিরে সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড পাওয়ার প্রতিযোগিতা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
পর্যবেক্ষক কার্ড যদি যাচাই ছাড়াই বিতরণ করা হয়, তাহলে সেটি দায়িত্ববান সাংবাদিককে শক্তিশালী করার বদলে ভুয়া পরিচয়কে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এর পরিণতি শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, পুরো গণতান্ত্রিখক প্রক্রিয়ার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিকতা কখনোই ক্ষমতা প্রদর্শনের লাইসেন্স ছিল না। বরং এটি ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলার সাহসের নাম। যে পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখানো, ব্ল্যাকমেইল কিংবা বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়—তা সাংবাদিকতার ব্যর্থতা নয়, বরং অপব্যবহার। আর এই অপব্যবহার চলতে থাকলে সমাজের চোখে প্রকৃত সাংবাদিকরাও একদিন সন্দেহের তালিকায় পড়ে যাবেন।
এখন সময় এসেছে কেবল ভুয়া সাংবাদিকদের চিহ্নিত করার নয়, বরং সাংবাদিক পরিচয়ের মানদণ্ড নতুন করে নির্ধারণ করার। কারা সাংবাদিক হবেন, কী যোগ্যতায় হবেন এবং কীভাবে সেই পরিচয় বহন করবেন—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি বিতর্কিত পরিচয় হিসেবেই টিকে থাকবে।
সাংবাদিকতার শক্তি কার্ডে নয়, কলমে। সম্মান আসে যাচাই করা তথ্য, নৈতিক অবস্থান ও জনস্বার্থে আপসহীন ভূমিকা থেকে। পরিচয় যদি দায়িত্বের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তাহলে সেই পেশার ভিত নড়বড়ে হতে বাধ্য। তাই ভুয়া পরিচয়ের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে সাংবাদিকতাকেই নিজের সীমা ও মর্যাদা নিজ হাতে রক্ষা করতে হবে।