সাতক্ষীরায় বরই চাষে অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষাও তৈরী করেছে
মাসুদ আল হাসান, খুলনা ব্যুরো :
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিকাজকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অতিবৃষ্টি, তীব্র গরম এবং নদীর লবণাক্ত পানি অনেক অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি করছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে "বরই চাষ"।
বরই গাছ স্বল্পমাত্রার লবণ ও আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে, দ্রুত ফলন দেয় এবং ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই এটি কেবল মৌসুমি ফল নয়, বরং উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হচ্ছে। চলতি বছরে সাতক্ষীরায় ৮৪৬ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে, যা থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কৃষকরা বেড বা উঁচু ঢিবি পদ্ধতিতে বরই চাষ করছেন। একই সঙ্গে জমির আইলে সবজি এবং ঘেরে মাছের সমন্বয় করা হচ্ছে। এভাবে এক ধরনের ‘ত্রিমুখী সমন্বয়’ বা ‘প্রকৃত অভিযোজন’ তৈরি হচ্ছে। যখন এক ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন অন্যটি আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ এ চাষ পদ্ধতিকে আরও লাভজনক করে তুলেছে।
স্থানীয় কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে বরই চাষ করছেন, তাই তারা চারা রোপণ, পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই বিষয়ে অভিজ্ঞ। এই চাষে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। প্রবীণ চাষি পাঞ্জাব আলী জানান, প্রতি মৌসুমে ১০–১২ লাখ টাকার মতো আয় হয় এবং ঝুঁকি অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম।
বরই পচনশীল হওয়ায় হিমাগারের অভাব একটি বড় সমস্যা। স্থানীয় পাইকারি বাজার না থাকায় কৃষকরা খুলনা বা সাতক্ষীরা বড় বাজারের ওপর নির্ভর করছেন, ফলে পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং ন্যায্য দাম পাওয়ায় অসুবিধা হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়াও আয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় বিলাতি মিষ্টি, থাই আপেল, বল সুন্দরী, কাশ্মির আপেল, দেশি আপেল, নারিকেল, বোম্বাই ও টক জাতের বরই চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ সঠিক জাত নির্বাচন, রোগবালাই মোকাবেলা এবং চারা সরবরাহের মাধ্যমে চাষিকে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় পাইকারি বাজার ও হিমাগার তৈরি হলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হলে দেশের রপ্তানি খাতেও নতুন মাত্রা যোগ হবে।
বরই চাষ কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সাতক্ষীরার বাগানগুলো এখন শুধু ফল উৎপাদনের স্থান নয়, বরং কৃষক, শ্রমিক ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।