অনিরাপদ খাদ্য বর্জন করুন

 প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:১১ অপরাহ্ন   |   সম্পাদকীয়

অনিরাপদ খাদ্য বর্জন করুন

 ইমদাদ ইসলাম

খাদ্য মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ চাহিদাপূরণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে নিরাপদ খাদ্যকে মৌলিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সেক্ষেত্রে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় খাদ্য পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষকে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করতে সকলকে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জীবন ধারণের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। আর এ খাদ্যের প্রধানত দুটি উৎস হলো উদ্ভিজ্ঞ ও প্রাণিজ। উদ্ভিজ্জ খাবার মূলত উৎপাদন হয় মাটিতে। স্বাস্থ্যকর মাটি ক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দেশের আবাদি জমির মাটির স্বাস্থ্য বর্তমানে হুমকির মুখে। একটি উর্বর কৃষিজমির মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ন্যূনতম ২ থেকে ৫ শতাংশ থাকা দরকার। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখন গড়ে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। জৈব পদার্থের অভাব, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার ও অপরিকল্পিত চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্রমেই কমছে। ফলে খাদ্যের গুণগত মান ও খাদ্যোৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য নিরাপদ হওয়াটা জরুরি। এরই মধ্যে দেশের জনগোষ্ঠীর বড়ো একটি অংশ অপুষ্টিসহ নানা অসংক্রামক রোগে ভুগছে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাবার গ্রহণ। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যান্সারসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি এতে মৃতের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়রিয়ার কারণে মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। আর এর অন্যতম কারণ ভেজাল খাবার গ্রহণ। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৫-এ উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং অপুষ্টির কারণে ৩ দশমিক ১ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এখনও অনেকেই খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে বিশ্বে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি জরুরি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অনিরাপদ খাদ্য বর্জনে সচেতন না হলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও সৃষ্টি হতে পারে বলে সচেতন হতে সকলকে আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

বিশ্বের বহু দেশে নিরাপদ খাদ্যকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে। জাপান এক্ষেত্রে একটি অন্যতম উদাহরণ। সেখানে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপদ খাদ্যের মানদন্ড ঠিক রাখা হয়। এছাড়া স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য কর্মসূচি এবং নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়। এজন্য উৎপাদন পর্যায়ে যেন খাদ্য নিরাপদ থাকে সেদিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণ থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ভেজালমুক্ত রাখা খুবই চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তাই কীভাবে এ পর্যায়ে কঠোর খাদ্যের গুণগতমান বজায় রাখা যায় সেটি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় করে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত এবং খাবার প্লেটে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্য নিরাপদ রাখতে না পারলে কখনোই সামগ্রিকভাবে সুস্থ জাতি গঠন করা যাবে না।

জলবায়ু পরিবর্তনসহ অকৃষি খাতে জমি ব্যবহারের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা এবং নগরায়ণের জন্য জমির ব্যবহার, কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষি কাজ অলাভজনক হয়ে উঠছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে কৃষিকাজ কষ্টসাধ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। নানা চ্যালেঞ্জের কারণে কৃষি খাতে উৎপাদন কমছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। এছাড়াও অন্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে আছে দুর্বল অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব এবং ফসলের সীমিত বৈচিত্র্যায়ন। এরই মধ্যে ধান উৎপাদন স্থবিরতার মধ্যে পড়েছে। কমেছে গম উৎপাদন। যদিও ডাল, শাকসবজি, মশলা ও ক্ষুদ্র শস্যের উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ যুবকেরা কৃষিকাজ থেকে নিজেদের দূরে রাখছে। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈদেশিক কর্মসংস্থান যাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত এ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কিছু কিছু যুবকদের অলস জীবনযাপনে অভ্যন্ত করে তুলেছে। তাছাড়া বাস্তবে সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা কম থাকায় কৃষি খাত একটি প্রিয় পেশা হিসেবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য সুখকর কোনো সংবাদ না। নগরায়ণ, দ্রুত শিল্পায়ন, বর্ধিত ভৌত অবকাঠামো এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ধীরে ধীরে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি হ্রাস হচ্ছে। ফলে মানুষ কৃষিবহির্ভূত খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রতি বছর আবাদযোগ্য জমি হ্রাস পাচ্ছে ১ শতাংশ হারে যা খুবই উদ্যোগজনক। কৃষিকাজে অতিমাত্রায় কিটনাশক ব্যবহার হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত ফসল অনেক সময় অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার মূল ভূমিকা পালন করবে সুস্থ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম। সুস্থ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে। তোলার প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যগ্রহণ। সমগ্র খাদ্য শৃঙ্খলে দূষণ ও ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রণীত হয় নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩। আইনটির বাস্তবায়নে ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সালে 'জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য'- রূপকল্পকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা এবং ভেজাল বিরোধী প্রচারণাসহ ভেজাল ও দুষিত খাদ্য বিক্রয়, আমদানি, মজুত ও প্রক্রিয়াকরণ বন্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে। খাদ্য ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ প্রদান; শিক্ষার্থীদের নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা, পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ খাদ্যের অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় গৃহিণীদের নিয়ে উঠান বৈঠক সারা দেশে আয়োজিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপ ও কার্যক্রমসমূহ ঝুঁকিভিত্তিক এবং কার্যকর টেকসই নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা গঠনকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করা হয়। কর্তৃপক্ষের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২২-২৬ এর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশে খাদ্যের নিরাপত্তার কার্যকর মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নিরাপদতার মানসমূহ দেশে প্রচলিত মানসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে খাদ্য নিরাপত্তায় বিভিন্ন রেগুলেশন ও প্যারামিটার হারমোনাইজ করা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নোটিফাই করা হচ্ছে, যাতে করে বৈশ্বিক নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যে বাংলাদেশও সমানভাবে অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে পারে এবং বাংলাদেশের পক্ষে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-ই হলো প্রথম প্রতিষ্ঠান, যেটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় এর স্যানিটারি এবং ফাইটোস্যানিটারি কমিটিতে নোটিফাই করেছে। এছাড়া পারিবারিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধিতে 'নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক পারিবারিক নির্দেশিকা' প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সারা দেশে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিতরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে কর্তৃপক্ষ খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে যাচাইয়ের মাধ্যমে হেলথ সার্টিফিকেট প্রদান করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপের গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। শুধুমাত্র সরকারের একার পক্ষে এ কাজটি করা সম্ভব হবে না। এজন্য সকলকে সচেতন হতে হবে এবং এক সাথে হয়ে কাজ করতে হবে।