পানি সংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ হতে পারে কার্যকর সমাধান

রোজিনা ইসলাম
১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন

সম্পাদকীয়

পানি সংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ হতে পারে কার্যকর সমাধান

বিশ্বজুড়ে নিরাপদ পানীয় জলের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং পানিদূষণের কারণে অনেক অঞ্চলে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণকে বৈশ্বিক শান্তি, জনস্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও এ সংকেত উদ্বেগজনক। এখনই বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পানির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা মার্সি কর্পসের এক প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে শহরটিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়া এবং পানির চাহিদার তুলনায় প্রাকৃতিকভাবে পানির পুনর্ভরণ কম হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংস্থাটির সতর্কতা অনুযায়ী, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কাবুল অদূর ভবিষ্যতে তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়তে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহরের জন্যও এ পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের পানিসম্পদে বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল ও মৌসুমি বৃষ্টির পানিতে সমৃদ্ধ হলেও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা সব এলাকায় সমান নয়। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন সম্প্রসারণ এবং শিল্পকারখানার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি নদী ও জলাশয় দূষণ, খাল ভরাট, জলাভূমি দখল এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। শহরের পাকা সড়ক, ভবন ও কংক্রিটের অবকাঠামোর বিস্তার বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশের সুযোগও কমিয়ে দেয়। ফলে বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি হলেও তার একটি বড় অংশ দ্রুত নালা-নর্দমা দিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের চাষ, সেচের পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অনেক এলাকায় এ পানির প্রধান উৎস ভূগর্ভস্থ পানি। ফলে কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালির পানির চাহিদা একসঙ্গে বাড়তে থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির মজুতের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।


এ অবস্থায় সেচে পানির দক্ষ ব্যবহার, আধুনিক সেচপ্রযুক্তির প্রসার এবং বিকল্প পানির উৎস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কৃষিকাজে ব্যবহার করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।

বৃষ্টির পানি: সম্ভাবনাময় বিকল্প

বাংলাদেশে সাধারণত জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের বড় অংশ হয়ে থাকে। এই মৌসুমি বৃষ্টির পানি পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে তা পানির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহের পদ্ধতি বা ‘রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং’-এ বাড়ির ছাদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি পাইপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ট্যাংক বা জলাধারে জমা করা হয়। উপযুক্ত পরিশোধন ও মান পরীক্ষা সাপেক্ষে এ পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী বাগানে পানি দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা, শৌচাগার এবং অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে এর ব্যবহার করা যেতে পারে। যথাযথভাবে পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করার পর পানীয় হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।

তবে বৃষ্টির পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব সময় নিরাপদ নয়। ছাদের ময়লা, বায়ুদূষণ এবং অপরিষ্কার সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে পানি দূষিত হতে পারে। তাই পানি সংগ্রহের আগে ছাদ ও পাইপ পরিষ্কার রাখা, প্রাথমিক প্রবাহের পানি আলাদা করে দেওয়া, উপযুক্ত ফিল্টার ব্যবহার এবং সংরক্ষিত পানির নিয়মিত মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

নগর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা উৎসাহিত করা যেতে পারে। সরকারি ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও আবাসিক কমপ্লেক্সে এ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বড় পরিসরে পানি সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংগ্রহের সরঞ্জাম কেনায় প্রণোদনা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এ উদ্যোগের প্রসার ঘটতে পারে।

শুধু ভবনভিত্তিক পানি সংরক্ষণ নয়, শহরের খাল, পুকুর, জলাধার ও জলাভূমি রক্ষা করাও জরুরি। এসব প্রাকৃতিক জলাধার বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। পরিকল্পিত নগরায়ণের অংশ হিসেবে পানি ধারণের জায়গা সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

জনসচেতনতা ও নীতিগত সহায়তা জরুরি

বৃষ্টির পানি সংগ্রহব্যবস্থা জনপ্রিয় করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অনেকেই এ পদ্ধতির উপকারিতা, স্থাপনের নিয়ম কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, প্রচারাভিযান এবং সফল প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরার মাধ্যমে মানুষকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে পানি ব্যবহারে অপচয় রোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন পর্যবেক্ষণ এবং পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ পানি পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় চাহিদা বেশি এবং কোথায় সংকট তীব্র—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।

পানির ন্যায্য বণ্টনই টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি

পানি কেবল মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ নয়; কৃষি, শিল্প, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপদ পানির অভাব মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদের প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। তাই পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য বণ্টন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন আলোচনায় ভবিষ্যতে পানি নিয়ে সংঘাতের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ঝুঁকি কমাতে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাভূমি রক্ষা, কৃষিতে পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতের পানি সংকটের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে নাগরিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও ভূমিকা রয়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংগ্রহকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে কার্যকর অবদান রাখতে পারে।