ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি শুধু বর্ষাকালে সীমাবদ্ধ নয়; অনুকূল পরিবেশ থাকলে বছরের অন্যান্য সময়েও এ রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাই প্রয়োজন ব্যক্তিগত সতর্কতা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কার্যক্রম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কারও উপসর্গ মৃদু হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত, সতর্কসংকেত পর্যবেক্ষণ এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি ডেকে আনতে পারে বিপদ
এডিস মশা সাধারণত বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, অব্যবহৃত বোতল, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, খোলা পানির পাত্র, ছাদের কোণ এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
শুধু বড় জলাশয় বা নর্দমা পরিষ্কার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিশ্চিত হয় না। বাড়ির ভেতরে ও বাইরে ছোট ছোট পাত্রে জমে থাকা পানিও নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। পানির ট্যাংক ও সংরক্ষণপাত্র ঢেকে রাখা, সপ্তাহে অন্তত একবার পাত্র খালি করে ঘষে পরিষ্কার করা এবং অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী অপসারণের মাধ্যমে মশার বংশবিস্তার কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ চিনে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি
ডেঙ্গুতে সাধারণত হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গ অন্য রোগের ক্ষেত্রেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া যায় না; চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে। রোগের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত অনেক সময় জ্বর কমার পরও দেখা দেয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসায় অবহেলা নয়, নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণেও সতর্কতা
ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর বা ব্যথার জন্য ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসক বা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলতে হয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক, স্যালাইন বা অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থতা, বারবার বমি কিংবা শরীরে তরল জমার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান জরুরি।
এছাড়া ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন, যাতে মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কার্যকর স্থানীয় উদ্যোগ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মশার প্রজননক্ষেত্র শনাক্ত ও ধ্বংস, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। মশা মারার ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও পাশাপাশি প্রজননক্ষেত্র নির্মূল করতে হবে। কারণ জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা থেকে গেলে শুধু উড়ন্ত মশা নিধনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাজার ও নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনসচেতনতামূলক প্রচার, স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং রোগীর তথ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
নাগরিক সচেতনতাই হতে পারে প্রতিরোধের প্রথম ধাপ
ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে দিনের বেলাতেও মশার কামড় এড়িয়ে চলতে হবে। শরীর ঢাকা পোশাক পরা, প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, দরজা-জানালায় জাল লাগানো এবং দিনের বেলায় বিশ্রামের সময় মশারি ব্যবহার করা উপকারী। পাশাপাশি বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
পরিবারের সবাই মিলে সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি দিন বাড়ির ভেতর ও বাইরের সম্ভাব্য মশার প্রজননক্ষেত্র পরীক্ষা করতে পারেন। প্রতিবেশীদেরও এ কাজে যুক্ত করা গেলে এলাকার সামগ্রিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এ রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস। আজ থেকেই প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ডেঙ্গু ও গুরুতর ডেঙ্গু বিষয়ক নির্দেশনা।