ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয় চাই সচেতনতা
সেলিনা আক্তার
সম্প্রতি ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকায় কয়েকবার
ভূমিকম্প অনুভূত হয়। একই সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
রিখটার স্কেলে এগুলোর মাত্রা যদিও কম ছিল তবে শঙ্কা রয়েই গেছে। সারা পৃথিবীতে সংঘটিত
প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি ভূমিকম্প। আমাদের দেশে প্রায় প্রতিবছর মৃদু মাত্রায় ভূমিকম্প
অনুভূত হয়। পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে যে কোনো সময় ভূমিকম্প হতে পারে। বাংলাদেশ ভূমিকম্পের
জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে উচ্চ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকা ধ্বংসস্তূপে
পরিণত হবে। দেশ- বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় বিষয়টি উঠে আসছে। সরকার প্রণীত ভূমিকম্প ঝুঁকি
নিরূপণ মানচিত্রে; যেখানে পুরো দেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন
দেশগুলো হচ্ছে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনা।
আর ঝুঁকি-২ বা মধ্যম ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, টাঙ্গাইল,
গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও কুড়িগ্রাম। এর বাইরে দেশের অন্যান্য
এলাকাগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১৯৮৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১৪টি মাঝারি
মানের ভূমিকম্প বাংলাদেশ ও এর আশপাশ অঞ্চলে হয়েছে, যার অধিকাংশেরই উৎপত্তিস্থল ছিল
ভারত; বিশেষ করে ত্রিপুরা, আসাম ও মিজোরাম অঞ্চলে। ১৯৮৮ সালে ৫.৮ মাত্রার ভূমিকম্প
সিলেট অঞ্চল বেশ জোরেশোরে কেঁপে উঠে, যার স্থায়িত্ব ছিল ৫০ সেকেন্ডেরও বেশি। আর এ ভূমিকম্পের
উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ১৯৮৯ সালে ৫.২ মাত্রায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে
সিলেট ও এর আশপাশ এলাকা। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,
২০১৮ সালে তিনবার, ২০১৯ সালে একবার, ২০২০ সালে দুবার, ২০২১ সালে তিনবার ও ২০২২ সালে
একবার ভূকম্পন হয়েছে, যার গড় মাত্রা ছিল ৪.১ থেকে ৫.৬ এর মধ্যে। আবহাওয়া অধিদফতরের
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখ
পর্যন্ত দেশে ছয়টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। দুই মাস পর ২১ নভেম্বর আবারো ভূকম্পন অনুভূত
হলো। যার মাত্রা মাঝারি। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও আশপাশের দেশগুলোতে ৫৩টি ভূমিকম্প
হয়। এ ছাড়াও ২০২৩ সালে ৪১টি বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ মূলত ইন্ডিয়ান প্লেটের ওপর অবস্থিতিত।
আর এ প্লেট ক্রমাগতভাবে উত্তর ও উত্তর পূর্ব দিকে ইউরোশিয়ান প্লেটের দিকে ধাবিত হচ্ছে,
যার পরিমাণ প্রতিবছরে ৪ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার। এর ফলে ইন্ডিয়ান প্লেট
ইউরোশিয়ান প্লেটের নীচে ঢুকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যে কোনো সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত
হানতে পারে। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য আমাদের সচেতন থাকার
পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের
তথ্য মতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী
ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
ছোটোখাটো কম্পন দেশের আরো শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা নির্দেশ করে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস
পাওয়া গেলেও ভূমিকম্পের বেলায় সুযোগ নেই। ভূমিকম্পে ঘরের ছাদ বা দেয়াল ধসে, বৈদ্যুতিক
খুঁটি বা গাছ পড়ে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি ঘটে থাকে। এছাড়া বৈদ্যুতিক তার পড়ে বা গ্যাস লাইন
ফেটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং তাতে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। ফলে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা
গড়ে তুলে হতাহতের ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমাদের জরুরি
পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০ অনুযায়ী
ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরান ভবনগুলোর সংস্কার ও শক্তিশালী
করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সব বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা
জোরদার করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের সংযোগ ঝুঁকিমুক্ত কি না তা নিয়মিত
পরীক্ষা করা ও এগুলো অবস্থান এবং বন্ধ করার নিয়ম সম্পর্কে বাসার সকলকে জানিয়ে রাখা;
জরুরি অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য একাধিক পথ ও বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা পরিবারের
সকলকে দেখিয়ে রাখা; ভূমিকম্পের কারণে ঘরের ভারি আসবাবপত্র যেমন- আলমারি, শেল্ফ, ফুলের
টব, ছবির ফ্রেম ইত্যাদি পড়ে গিয়ে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটতে পারে সেজন্য পেছনে থেকে আংটা
লাগিয়ে দেয়ালের সাথে আটকিয়ে রাখা; ভারি ও ভঙ্গুর জিনিসপত্র সেলফের নীচের দিকে রাখা;
জরুরি টেলিফোন নম্বর যেমন ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, হাসপাতাল ও অন্যান্য
জরুরি নাম্বারগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি সব ভবন বা স্থাপনায় সংরক্ষণ করা এবং
তা দৃশ্যমান স্থানে লিখে রাখতে হবে যাতে সকলে তা দেখতে পারে; বহুতল ভবন, মার্কেট, হোটেল,
বিদ্যালয়ের সিঁড়ি প্রশস্থ করা এবং জরুরি দরজা ও সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা, ভূমিকম্পের সময়
আত্মরক্ষার জন্য ঘরে একটি ব্যাগে রেডিও, টর্চ লাইট, হাতুড়ি, হেলমেট, কুড়াল ও প্রাথমিক
চিকিৎসার সরঞ্জামসমূহ শিশু যন্ত্রের সামগ্রী মজুত রাখতে হবে। প্রয়োজনে ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ
গ্রহণ করে দুর্যোগকালীন সময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত এবং কী
নয়- এ বিষয়ে ধারণা থাকা খুবই জরুরি। ভূকম্পন অনুভূত হলে শান্ত থাকতে হবে,
আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করা বা সাথে সাথেই
বাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। কারণ ভূমিকম্প সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড
স্থাযী হয় এবং তা বুঝে উঠতেই ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় চলে যায়। তাই ভূমিকম্পের সময় ভবন
থেকে দৌড়ে বের হওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্পের সময় বিছানায় থাকলে বালিশ দিয়ে মাথা
ঢেকে নিতে হবে এবং টেবিল, ডেস্ক বা শক্ত কোনো আসবাবপত্রের নীচে আশ্রয় নিতে হবে। যার
নীচে আশ্রয় নেবেন তা এমনভাবে ধরে থাকতে হবে যাতে সেটি মাথার ওপর থেকে সরে না যায়। এ
সময় শক্ত দরজার চৌকাঠের নীচে অথবা পিলারের পাশে আশ্রয় নেয়া উত্তম। রান্নাঘরে থাকলে
যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে হবে। সম্ভব হলে দ্রুত বাড়ির বিদ্যুতের মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন
করতে হবে এবং গ্যাসের চাবি বন্ধ রাখতে হবে। উঁচু বাড়ির জানালা, বারান্দা বা ছাদ থেকে
লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা বোকামি। এ সময় লিফট ব্যবহার করা বিপজ্জনক। ঘরের বাইরে থাকলে
গাছ, উঁচু বাড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে খোলাস্থানে আশ্রয় নিতে হবে। জনাকীর্ণ ঘর
যেমন- গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল, সিনেমা হল, মার্কেটে থাকলে বাইরে বের হওয়ার
জন্য দরজার সামনে ভিড় করা উচিত নয়। গাড়িতে থাকলে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বিদ্যুতের
খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামাতে হবে। ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করতে
হবে। ভূমিকম্পের ফলে ভাঙা দেয়ালের নীচে চাপা পড়লে বেশি নড়াচড়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
এ সময়ে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে যাতে ধুলোবালি শ্বাসনালিতে না ঢোকে। সম্ভব হলে
দেয়ালের পাশে সরে আসতে হবে এবং উদ্ধারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হবে। শেষ
প্রচেষ্টা হিসেবে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, এ সময় যাতে শ্বাসযন্ত্রে
ধুলোবালি প্রবেশ না করে। এ সকল বিষয় ছাড়াও ভূমিকম্প পরবর্তীতে করণীয় কিছু বিষয় রয়েছে।
কারণ সাধারণত একবার ভূমিকম্প হলে পরপর কয়েকটি কম্পনের ঘটনা ঘটে থাকে। ভূমিকম্প পরবর্তী
করণীয়সমূহ হলো- প্রথমবার অনুভূত কম্পন থেমে যাওয়ার পর ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে সারিবদ্ধভাবে
বের হয়ে খালি জায়গায় আশ্রয় নেওয়া; বৈদ্যুতিক বা টেলিফোনের খুঁটি ও তার, উঁচু দেয়াল
ও ভবন থেকে দূরে থাকা: গ্যাস বা অন্য কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের গন্ধ পেলে নিরাপদ দূরত্বে
সরে যাওয়া; জরুরি তথ্য পাওয়ার জন্য সম্ভব হলে রেডিওসেট ব্যবহার করা; কেউ অসুস্থ হলে
যথাসম্ভব দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা; উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সংস্থাসমূহকে
সহযোগিতা করা; উদ্ধারের ক্ষেত্রে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
মনে রাখতে হবে- প্রথমবার কম্পনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন,, ব্রিজ
ও বিভিন্ন অবকাঠামো পরবর্তী ভূকম্পনে ধসে যেতে পারে, তাই সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা
করতে হবে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব।
তাই এ সকল বিষয়ে নিজে জানতে হবে ও প্রতিবেশীকে জানাতে হবে। সর্বোপরি ভূমিকম্পের ঝুঁকি
মোকাবিলায় প্রয়োজন নিজ দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে সম্মিলিত প্রচেষ্টা।