পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে উত্তাল শিল্পাঞ্চল, আজ মজুরি বোর্ডের ঘোষণা
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পুনর্নিয়োগের দাবিতে তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। শনিবার রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রোববার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
শনিবার রাজধানীর পল্টনে শ্রম ভবনে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান মন্ত্রী। এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আলোচনা করেন শ্রমমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মন্ত্রী বলেন, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি সরকার এবং পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠনই মেনে নিয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে বোর্ডের জন্য তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিদের নাম জমা দিয়েছেন। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান করতে সরকার আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
মজুরি নির্ধারণে থাকবে তিন পক্ষ
নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিরা থাকবেন। তাঁদের আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে। পরে শ্রম মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত মজুরি ও তা কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করা হবে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণভাবে পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া থাকলেও শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ সময়সীমা তিন বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে চলতি বছরের নভেম্বরে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রত্যাশা ছিল।
শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য মালিকপক্ষকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন শ্রমমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়ার বিষয়েও বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
মন্ত্রী শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে এসে শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কারখানার উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মালিকদের আয় ব্যাহত হবে। এর প্রভাব শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের ওপরও পড়তে পারে।
মিরপুরে সড়ক অবরোধ, কারখানা ও মার্কেটে ভাঙচুর
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শনিবার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৯টার পর মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, সাড়ে ১১, মিরপুর-১২, মিরপুর-১ ও শাহ আলী এলাকায় শ্রমিকদের জমায়েত দেখা যায়। তাঁদের অবরোধে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং আশপাশের সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভ চলাকালে কালশী, শাহ আলী ও মিরপুর-১ এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানা ও মার্কেটে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হাতাহাতি হয়। মিরপুর-১-এর মল্লিক টাওয়ার এবং পল্লবীর কালশীর আদর্শনগর এলাকার একটি পোশাক কারখানায়ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
প্রায় ছয় ঘণ্টা পর বিকেল ৪টার দিকে বিক্ষোভকারীরা সড়ক ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এর আগে বৃহস্পতিবারও একই দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করেছিলেন শ্রমিকেরা।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১৫
সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শনিবার দিনভর শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক, পুলিশ ও পথচারীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সকাল ৮টার পর কাঠগড়া, আমতলা, নয়াপাড়া ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। পরে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। শিল্পাঞ্চলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কাঠগড়া, জিরাব, নরসিংহপুর ও আমতলাসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শিল্প পুলিশ জানায়, নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ কারখানার সামনে থেকে তিনটি হাতবোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া শারমিন গ্রুপের কার্যালয় লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে আশুলিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আগামী কয়েক দিন শিল্পাঞ্চলে বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখা হবে।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, যানজটে ভোগান্তি
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শনিবার দুপুর থেকে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পল্লী বিদ্যুৎ মোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। সন্ধ্যায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
কালিয়াকৈরের ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকেরা প্রথমে কর্মবিরতি শুরু করেন। দুপুরের বিরতিতে কারখানা থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা আর কাজে ফেরেননি। পরে আশপাশের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে যোগ দেন। হরিণহাটি, সফিপুর, মৌচাক ও খাড়াজোড়া এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আন্দোলন চলছিল। সংঘর্ষে চার থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে আশপাশের অন্তত ১২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
‘১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানো কঠিন’
বাংলাদেশ পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি তৌহিদুর রহমান বলেন, মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা শিল্প এলাকায় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রমিক দুপুরের পর কাজে ফেরেননি।
তাঁর মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও বাড়িভাড়া বাড়তে থাকায় বর্তমান মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণ জরুরি।
অন্যদিকে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান শ্রমিকদের দাবিকে ন্যায্য উল্লেখ করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দাবি আদায়ের আন্দোলনে জানমালের ক্ষতি ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়—এমন কর্মসূচি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
শ্রমমন্ত্রীও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারির পর শ্রমিকদের দাবির পরবর্তী অগ্রগতি এবং শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।