রাজশাহীতে মির্জা ফখরুলকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও: কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধর ও পুলিশে সোপর্দ
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও প্রকাশের জেরে রাজশাহীর বাগমারায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আবদুল কাদের ওরফে সজীব নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বুধবার রাতে বাগমারার ভবানীগঞ্জ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত আবদুল কাদেরকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বাক-স্বাধীনতার সীমা কতটুকু এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে রসিকতার পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। সেখানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মন্ত্রীর সেই সফর ও অনুষ্ঠান উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ‘ডিয়া ব্লগ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ‘ছতর জুটি’ খ্যাত শিমুল নামের এক টিকটকারের নেতৃত্বে একদল তরুণ ব্যক্তিগত গাড়িতে করে পতিসর যাওয়ার পথে যাত্রাপথে থেমে মন্ত্রীকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গি করছেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অভিযুক্তদের ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্ত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুল কাদের কান ধরে ক্ষমা চেয়ে একটি পাল্টা ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, পেশাগত কারণেই তিনি নিয়মিত হাস্যরসাত্মক ভিডিও তৈরি করেন এবং রবীন্দ্র মেলার উদ্বোধন নিয়েও কেবল বিনোদনের ছলে ভিডিওটি করেছিলেন। তবে তার এই ক্ষমা প্রার্থনায় নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। বুধবার রাতে তাকে খুঁজে পেয়ে স্থানীয় যুবদল ও তাঁতী দলের কর্মীরা চড়-থাপ্পড় মারেন এবং পরে তাকে বাগমারা থানায় নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের কাছে সোপর্দ করার আগে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। নেতা-কর্মীদের দাবি, একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা কেবল বিনোদন হতে পারে না, এটি সুস্পষ্ট মানহানি।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, ভিডিওটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তবে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার পর আবদুল কাদের তার ভুল স্বীকার করেছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করেছেন। ওসি আরও জানান, যেহেতু এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি এবং বিষয়টি আমলযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না, তাই তাকে গ্রেপ্তার দেখানো সম্ভব হয়নি। মূলত আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে এবং পরিবারের অনুরোধে তাকে জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত শিমুল বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। পুলিশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। স্থানীয় সুধী সমাজের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কন্টেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা ও শালীনতার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, অন্যথায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়।