ট্রাম্পের মেয়াদ শেষের আগে মধ্যপ্রাচ্যে বদলের তাগিদ
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পরিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, ইরান, গাজা ও লেবানন-তিন ক্ষেত্রেই বর্তমান উদ্যোগগুলো ত্রুটিমুক্ত নয়। তবে বিকল্প হিসেবে যে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার তুলনায় এগুলো এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্য-আমেরিকা সংলাপের সম্মেলনে বিষয়টি বারবার উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, নিখুঁত সমাধানের অপেক্ষায় থেকে চলমান উদ্যোগগুলো থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
আদর্শ পরিস্থিতি হিসেবে তাঁরা এমন একটি ইরানের কথা বলেছেন, যেখানে নতুন সরকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা পরিত্যাগ করবে; এমন একটি লেবানন, যেখানে কোনো সশস্ত্র সংগঠনের বদলে রাষ্ট্রই দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে; এবং এমন একটি গাজা, যেখানে হামাসের সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে সময় লাগবে। এদিকে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে বাকি প্রায় ২৮ মাস। এই সময়ের মধ্যে ইরান, গাজা ও লেবাননে যে প্রক্রিয়াগুলো শুরু হয়েছে, সেগুলোকে এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন এলেও সেগুলো সহজে বদলে না যায়-এমন মত উঠে এসেছে সম্মেলনে।
ইরানে চাপ ধরে রাখার তাগিদ
সম্মেলনে ইরান নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশটির ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ। সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত যন্ত্র, গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্র এবং অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো।
এ ছাড়া দেশটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন বলেও আলোচনায় দাবি করা হয়। ইরানের পারমাণবিক জ্ঞান ও বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত কর্মসূচি পুনর্গঠনে সময়, অর্থ ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নজিরবিহীন মাত্রার সামরিক সমন্বয় ছিল বলেও সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে। অভিযানের সময় নির্ধারণেও কৌশলগত বিস্ময়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল বলে একজন অংশগ্রহণকারী জানান।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সম্মেলনে বলা হয়। একজন অংশগ্রহণকারীর দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা আগের তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর অর্থ ইরানের হাতে থাকা অস্ত্রের সংখ্যা এতটা কমে গেছে নয়; বরং নতুন অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা কমেছে।
এই পরিস্থিতির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধের চাপ আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এর লক্ষ্য ইরানকে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের অর্থ ব্যয় এবং অর্থনীতি সচল রাখার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলা।
ইরানের ভেতরের বিক্ষোভ নিয়েও আলোচনা
সম্মেলনে জানানো হয়, জানুয়ারিতে ইরানে যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা তেহরানের বাজার এলাকা থেকে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামার আহ্বান ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হলেও পরে ইসরায়েল বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য ইরানিদের উৎসাহিত করেছিল বলে একজন ইসরায়েলি অংশগ্রহণকারী জানান।
বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে হাজারো মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন বলে সম্মেলনে দাবি করা হয়। এরপরও বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পরদিন আবার রাস্তায় নামে। অংশগ্রহণকারীদের মতে, এতে বোঝা যায় যে ইরানে শুধু সরকারের বিরোধিতা নয়, সরকারের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাও তৈরি হয়েছে।
সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমান চাপ ইরানের ভেতর থেকেই পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে এর জন্য বিকল্প নেতৃত্ব, দেশের ভেতরে প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় মানুষের প্রয়োজন হবে। এখানে স্থল আক্রমণের কথা বলা হয়নি; বরং ইরানের ভেতরে কাজ করতে সক্ষম ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে।
ইরান অবশ্য আশা করছে, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে পারলে মার্কিন চাপ কমে যাবে। তাই ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেহরানকে বোঝানো যে এই নীতি শুধু ট্রাম্পের সময়ের জন্য নয়, পরবর্তী প্রশাসনেও অব্যাহত থাকতে পারে।
গাজায় ধৈর্যের প্রয়োজন
গাজা নিয়ে আলোচনায় ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনাকে সময় দেওয়ার পক্ষে মত এসেছে। পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রভাব কমানো।
তবে পরিকল্পনাটি এখনো নানা সমস্যায় আটকে আছে। হামাসের হাতে অস্ত্র রয়েছে, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি এবং গাজা পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত বেসামরিক প্রশাসন এখনো গাজা শহরে কাজ শুরু করতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক অবকাঠামোগত ধ্বংস।
তবু সম্মেলনে প্রশ্ন উঠেছে-এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প কী? সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে হামাসের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অনির্দিষ্টকাল ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি, সংস্কারহীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রত্যাবর্তন কিংবা নতুন করে বড় সামরিক অভিযান-এসব পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।
একজন অংশগ্রহণকারীর মতে, পরিকল্পনাটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও সেটিকে বাস্তবায়নের সুযোগ শেষ না করে আবার গাজায় বড় সামরিক অভিযান শুরু করা উচিত নয়।
ট্রাম্প নিজে এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এবং এর তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পরিকল্পনাটিকে বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গাজা নিয়ে আলোচনায় ‘উগ্রবাদমুক্তকরণ’কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছে। শুধু হামাসের সদস্যদের হত্যা বা সুড়ঙ্গ ধ্বংস করলেই যুদ্ধের সমাপ্তি হবে না; হামাসের মতাদর্শ যাতে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে আবার ছড়িয়ে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে বলে মত এসেছে।
এই পরিবর্তন দ্রুত সম্ভব নয়। এতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা প্রয়োজন হবে বলে আলোচনায় বলা হয়েছে।
লেবাননেও নতুন সুযোগের কথা
লেবানন নিয়েও একই ধরনের ধৈর্যের আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশটিতে হিজবুল্লাহ এখনো অস্ত্রধারী। ইসরায়েলি বাহিনী যেসব এলাকা ছেড়ে যাবে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা লেবাননের সেনাবাহিনীর এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
হিজবুল্লাহ অস্ত্র জমা দিয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর হিজবুল্লাহ আবার ফিরে এলে কী হবে-এই প্রশ্নও রয়ে গেছে।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট এলাকায় ধাপে ধাপে লেবাননের সেনা মোতায়েন, হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরানোর যাচাই এবং এরপর ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
তবে এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া এবং লেবাননের সেনা মোতায়েন না হওয়া পর্যন্ত তারা সরে যাবে না। অন্যদিকে লেবাননের বক্তব্য, ইসরায়েল প্রত্যাহার শুরু না করলে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর কি না, তা প্রমাণ করা কঠিন।
লেবাননে সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক ব্যর্থতায় পরিণত না করার বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান এসেছে। ইসরায়েল যদি নিয়মিত হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার চেষ্টা করে, তাহলে সংগঠনটি আবারও নিজেদের ইসরায়েলবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ লেবাননের শিয়া জনগোষ্ঠীর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। লেবাননের সরকারকে দেখাতে হবে যে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা, পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে।
ইরান, গাজা ও লেবানন-তিন ক্ষেত্রেই সামনে থাকা প্রক্রিয়াগুলো ধীর, অনিশ্চিত এবং নানা ঝুঁকিতে ভরা। তবে ওয়াশিংটনের সম্মেলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, নিখুঁত সমাধানের অপেক্ষায় থেকে বর্তমান সুযোগ হারানোর চেয়ে চলমান উদ্যোগগুলোকে সময় দেওয়া জরুরি।