গালিবাফের অঙ্কে কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার ঠিক হয়?
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ব্যঙ্গ করতে এবার গণিতের সূত্র ব্যবহার করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অর্থনীতিতে ব্যবহৃত ‘টেলর রুল’-এর আদলে একটি সূত্র তুলে ধরে সুদহার, তেলের সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে একই সমীকরণে টেনে আনেন।
গালিবাফের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতিকে বিদ্রূপ করা। তিনি ইঙ্গিত দেন, সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ালেই হরমুজ প্রণালি খুলবে না কিংবা তেলের একটি ব্যারেলও বাড়তি উৎপাদন হবে না।
গালিবাফের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ নীতিগত সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ায়। তিন বছরের মধ্যে এটিই ছিল ফেডের প্রথম সুদহার বৃদ্ধি।
টেলর রুল কী?
গালিবাফ যে সূত্রের কথা বলেছেন, সেটি অর্থনীতিতে ‘টেলর রুল’ নামে পরিচিত। অর্থনীতিবিদ জন টেলর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এই সূত্র তৈরি করেন।
মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির প্রকৃত উৎপাদন সম্ভাব্য উৎপাদনের তুলনায় কোথায় অবস্থান করছে—এই দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কোন পর্যায়ে থাকা উচিত, তার ধারণা দিতে এই সূত্র ব্যবহার করা হয়।
সহজভাবে বললে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে বা অর্থনীতি সম্ভাব্য সক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হলে সুদহার বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। আবার মূল্যস্ফীতি কমলে কিংবা অর্থনীতি দুর্বল হলে সুদহার কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
তবে টেলর রুল কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার নির্ধারণের সময় মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ভোক্তা চাহিদা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক তথ্য বিবেচনা করে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি সুদহার বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে?
ফেডের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব ছিল বলে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। এসব কারণে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি।
ফেডের সুদহার বাড়ানোর পর দেওয়া বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সংঘাতে জ্বালানির দাম বাড়ায় ফেডের নীতিনির্ধারকেরাও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন।
বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, ইরান যুদ্ধ সরাসরি নয়, তবে পরোক্ষভাবে ফেডের সুদহার বাড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারে সুদের হার ও বন্ডের মুনাফা বাড়ার প্রবণতা মিলিয়ে ফেডের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটারের মতে, ইরানের পাল্টা হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং অপরিশোধিত তেলের উচ্চ দাম মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসকে আরও চাপে ফেলেছে। তবে তাঁর মতে, সুদহার বাড়ানোর পেছনে শুধু যুদ্ধ বা তেলের দাম নয়, আরও অনেক অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
তাহলে কি ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার ঠিক করছে?
না। যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নির্ধারণের ক্ষমতা ফেডারেল রিজার্ভের। ইরান সরাসরি এই সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না।
তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই অর্থে ইরানের কর্মকাণ্ড মার্কিন মুদ্রানীতিকে প্রভাবিত করা কিছু অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
কিন্তু ফেডের সিদ্ধান্তের পেছনে আরও অনেক বিষয় রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগ, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতিও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে ফেডকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সুদহার নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
গালিবাফের অঙ্কের আসল বার্তা কী?
গালিবাফের প্রকাশ করা সূত্রটি আসলে প্রচলিত টেলর রুলের একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ। তিনি এতে হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ঝুঁকি যুক্ত করেছেন।
তাঁর বক্তব্য হলো, সুদহার বাড়িয়ে কোনো সামুদ্রিক পথ খুলে দেওয়া যায় না, আবার সুদহার বাড়িয়ে তেলের শারীরিক সরবরাহের ঘাটতিও পূরণ করা যায় না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক নেগার মরতাজাভির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবহৃত অর্থনৈতিক ভাষাকেই পাল্টা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বার্তা হলো-সুদহার বাড়ানো গেলেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ, গালিবাফের সূত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নির্ধারণের কোনো বাস্তব অর্থনৈতিক প্রস্তাব নয়। বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য এবং তেল সরবরাহের ওপর ইরানের প্রভাব তুলে ধরার একটি রাজনৈতিক বার্তা।
এর আগে যুদ্ধ চলাকালেও গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেলের দাম, বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে নিয়মিত মন্তব্য করেছেন। গত মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসংকট নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারচিত্র প্রকাশ করেছিলেন।
এবারের ‘গণিতের অস্ত্র’ও একই ধারার অংশ। সুদহার, তেলের দাম ও হরমুজ প্রণালির মতো অর্থনৈতিক বিষয়কে এক সূত্রে এনে গালিবাফ মূলত বোঝাতে চেয়েছেন-যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সামাল দেওয়া যায় না।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবিও অবশ্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডের দাবি, প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে এবং মার্কিন বাহিনী সেই চলাচল নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে ইরান এই জলপথকে ঘিরে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার কথা তুলে ধরছে।
তাই গালিবাফের অঙ্কের বক্তব্যকে বাস্তব অর্থে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নির্ধারণ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জ্বালানি সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের প্রভাবের বার্তা দেওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল।
সূত্র: আলজাজিরা