রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বিল পাস, ট্রাম্পের শুল্কক্ষমতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়েছে। তবে বিলটি পাসের পথে বড় বাধা ছিল ডেমোক্র্যাটদের একাংশের আপত্তি। তাঁদের আশঙ্কা, আইনটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শুল্ক আরোপের যে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেবে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বুধবার ২৬২-১৫৯ ভোটে বিলটি পাস হয়। নির্বাচন দিবসের পর পর্যন্ত আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটন ছেড়ে যাওয়ার আগে এটিই ছিল প্রতিনিধি পরিষদের শেষ অধিবেশন। বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট; বিপক্ষে ছিলেন সাতজন রিপাবলিকান।
গত আগস্টে মার্কিন সিনেটে বিপুল দ্বিদলীয় সমর্থনে বিলটি পাস হয়েছিল। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা আলোচনা ও দর-কষাকষির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের পর বিলটি এখন ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে যাবে।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বিলটি পাসের পর এক বিবৃতিতে বলেন, “এই বিল আমেরিকার ঐক্যের একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাচ্ছে এবং এই যুদ্ধকে ন্যায্য পরিণতিতে নিয়ে আসতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের হাতিয়ার দিচ্ছে। আমরা গর্বিত যে এটি প্রেসিডেন্টের ডেস্কে পাঠাতে পারছি।”
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের শাস্তির উদ্যোগটি লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর পর নতুন গতি পায়। জুলাইয়ে কিয়েভ সফর শেষে ফেরার পরপরই গ্রাহামের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আইনটির হালনাগাদ সংস্করণ এগিয়ে নিতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে।
রাশিয়ার তেল-গ্যাস ক্রেতাদের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক
‘দ্য লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এই আইনে রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতার ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে “উল্লেখযোগ্য” পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।
বিলটিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাঁর সরকারের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রুশ ধনকুবের বা অলিগার্ক এবং দেশটির ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় দুই ক্রেতা চীন ও ভারত। অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল ইউরোপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। একই সময়ে চীনে রাশিয়ার গ্যাস বিক্রি বেড়েছে।
ট্রাম্পের অনুরোধে বিলটিতে ইরানের জ্বালানি ও অস্ত্র খাতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা স্থগিত করতে পারবেন। এর জন্য তাঁকে কংগ্রেসকে প্রত্যয়ন করে জানাতে হবে যে এমন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের কয়েকজন বর্তমান কাঠামোয় বিলটির বিরোধিতা করেছেন। ভোটের ব্যাখ্যায় এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প “কঠোর অবস্থান নেওয়ার কোনো ইচ্ছা দেখাননি”।
হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস, ডেমোক্র্যাটিক হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটিক ককাসের চেয়ার পিট আগুইলার বলেন, “আমেরিকান পরিবারগুলোর খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে-এমন নতুন শুল্কক্ষমতা তাঁকে দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর ওপর আস্থা রাখা যায় না।”
ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি দলও গত সপ্তাহে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। নিউইয়র্কের গ্রেগরি মিকস, ভার্জিনিয়ার ডন বেয়ার এবং ম্যাসাচুসেটসের রিচার্ড নিল এক বিবৃতিতে বলেন, বিলটি প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা “নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেবে”।
তাঁদের বক্তব্য, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দুর্বল হতে পারে। তাঁদের মতে, রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে অর্থ জোগানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের হাতে এরই মধ্যে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। বিলটিতে যাদের লক্ষ্য করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও তিনি সেই ক্ষমতা “আরও দেরি না করে” ব্যবহার করতে পারেন বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।
ভোটের পর মিকস বলেন, তিনি আশা করেন ট্রাম্প তাঁকে ভুল প্রমাণ করবেন এবং আইনটি যেভাবে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করবেন।
তবে ট্রাম্প তা না করলে-যা ঘটার সম্ভাবনাই বেশি বলে মিকস মনে করেন-কংগ্রেস যাতে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনে, সে জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানান। একই সঙ্গে তাঁর ভাষ্য, মূল্যস্ফীতিমূলক শুল্কের কারণে যাতে মার্কিন জনগণ আরও চাপে না পড়ে এবং ইউক্রেন যাতে বাস্তব সহায়তা পায়, সেটিও তিনি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন।
রিপাবলিকানদের যুক্তি
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা প্রতিনিধি পরিষদের বিতর্কে বিলটির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমর্থনের কথা তুলে ধরেন।
টেক্সাসের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মাইকেল ম্যাককল প্রতিনিধি পরিষদে বলেন, জেলেনস্কির দলের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন যে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব-রাশিয়া বছরের পর বছর সেটিই করে আসছে। কিন্তু শুল্ক এড়ানো সম্ভব নয়।
ম্যাককলের মতে, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আরও বাড়ানোর শক্তিশালী উপায় হলো শুল্ক। তাঁর ভাষায়, “এই কারণেই শুল্কই এই বিলের দাঁত।”
এর আগে মঙ্গলবার বিলটি আরেকটি সম্ভাব্য বাধার মুখে পড়েছিল। বিলটি এবং আরও কয়েকটি অসংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের ওপর বিতর্কের পথ খুলতে একটি প্রক্রিয়াগত ভোট হয়। সেখানে অল্পসংখ্যক রক্ষণশীল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বিরোধিতা করেন অথবা সমর্থন দিতে বিরত থাকেন।
তবে দুই মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট-মেইনের জ্যারেড গোল্ডেন এবং ওয়াশিংটনের মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজ-দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে বিলটি এগিয়ে নিতে সহায়তা করেন। গোল্ডেন অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজ এমন একটি আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে তীব্র।
গোল্ডেন বলেন, নভেম্বর পর্যন্ত অধিবেশনের এটাই শেষ সপ্তাহ। সিনেটে ইতিমধ্যে বিপুল দ্বিদলীয় সমর্থন পাওয়া ইউক্রেন-সংক্রান্ত এই বিলকে শুধু একটি প্রক্রিয়াগত ভোটের কারণে আটকে দেওয়ার মতো বড় ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজ তাঁর নির্বাচনী এলাকার ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি সব সময় আমার সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের পাশে থাকব।”