বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নজরদারি বনাম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি: মহাসংকটে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং সুদূরপ্রসারী টানাপোড়েনের আভাস দিচ্ছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত চুক্তি। কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ডালপালা মেলা এই আলোচনা এখন ঢাকার রাজনীতির টেবিল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলেও প্রধানতম বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঢাকাকে 'জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট'- ‘ (জিএসওএমআইএ) এবং ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ)-এর মতো স্পর্শকাতর সামরিক চুক্তিতে সই করার জন্য এক ধরনের প্রচ্ছন্ন তাগিদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিরক্ষাভিত্তিক প্রতিবেদনে এরই মধ্যে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তিগুলো আলোর মুখ দেখলে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও নৌবাহিনীর কার্যক্রম নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল জাহাজগুলো বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি গ্রহণ এবং রসদ সরবরাহের মতো কৌশলগত সুবিধা পাবে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রতিরক্ষা নীতিকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই সম্ভাব্য চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের দুই প্রধান সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূরবর্তী ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বা আইপিএস-এর অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। তবে মার্কিন এই স্বার্থের সমান্তরালে বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থের একটি বড় টোপও জড়িয়ে রয়েছে এই চুক্তির সঙ্গে। সম্প্রতি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে উৎপাদিত নির্দিষ্ট কিছু পোশাকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব বাংলাদেশের ধুঁকতে থাকা তৈরি পোশাক খাতের জন্য আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিলেও, এর পেছনে থাকা ভূরাজনৈতিক ফাঁদ নিয়ে শঙ্কিত দেশের থিঙ্কট্যাংকগুলো। সামরিক তথ্যের পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মোড়কে মূলত চীন ও ভারতের প্রভাব বলয়কে টেক্কা দিতে ওয়াশিংটন ঢাকাকে একচেটিয়াভাবে নিজেদের শিবিরে টানতে চাইছে।
কিন্তু এই একমুখী কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই তার সামরিক সরঞ্জামের সিংহভাগ চীন থেকে আমদানি করে থাকে এবং বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গভীর অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব। এর আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও দাবি করেছিলেন যে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য তাঁর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, যদিও যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের অবাধ যাতায়াত ও লজিস্টিক সুবিধার পথ সুগম হলে তা চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিকে তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করবে। একই সাথে এটি ভারতের কৌশলগত আঙিনায় মার্কিন একাধিপত্যের ক্ষেত্র তৈরি করায় নয়াদিল্লিও এই সমীকরণকে খুব একটা স্বস্তির চোখে দেখবে না। ফলে এই অঞ্চলটি শেষ পর্যন্ত বিশ্বশক্তির সামরিক প্রতিযোগিতার এক বিপজ্জনক রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
এই স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যুতে দেশের ভেতর থেকেও তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের সুর শোনা যাচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এই প্রক্রিয়ার চরম অস্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, দেশের ভবিষ্যৎ ও ভূরাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জনপরিসরে কোনো আলোচনা না করে কিংবা জনগণকে অন্ধকারে রেখে কোনো চুক্তি সই করা হলে, তা ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম বিতর্কের জন্ম দেবে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বামপন্থী নেতা সাইফুল হক এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামরিক বিপদের কথা উল্লেখ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, এই চুক্তির কঠিন শর্তাবলীর কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার মতো অন্যান্য বন্ধুপ্রতীম দেশের সাথে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নতুন কোনো সহযোগিতায় জড়াতে পারবে না, যা দেশের এতদিনের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে চিরতরে সংকুচিত ও পঙ্গু করে দেবে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশের এই কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির সাথে একক বা একচেটিয়াভাবে এই ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি করা বাংলাদেশের জন্য মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। যদি বাংলাদেশকে তার বন্দর বা কৌশলগত সুবিধা কাউকে দিতেই হয়, তবে তা বৈশ্বিক নিয়মনীতি মেনে সবার জন্য উন্মুক্ত করা উচিত, ঠিক যেভাবে সিঙ্গাপুর তাদের বন্দর বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর জন্য উন্মুক্ত রেখেছে। ড. ইমতিয়াজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ যদি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিশেষ সুবিধা দেয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই ভারত, চীন বা রাশিয়ার মতো অন্য পরাশক্তিগুলোও একই ধরনের সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা দাবি করবে। আর যাদেরকে বাংলাদেশ এই সুবিধা দিতে ব্যর্থ হবে বা দেবে না, তাদের সাথে ঢাকার এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি হবে। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক মারাত্মক চোরাবালিতে আটকে পড়বে এবং দেশের ওপর চতুর্মুখী চাপ আসতে শুরু করবে।
যদিও সরকারের অভ্যন্তরে থাকা একটি পক্ষ মনে করছে যে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই প্রতিরক্ষা সম্পর্ক স্থাপন দেশের রফতানি খাত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে সুসংহত করবে, কিন্তু খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় একটি অংশ এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় দল এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাঁরা মনে করছেন, বেইজিংকে চটিয়ে বা রাশিয়ার মতো পরীক্ষিত বন্ধুকে দূরে ঠেলে ওয়াশিংটনের হাত ধরলে বাংলাদেশের যে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বপ্ন এবং মেগা প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা, তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। চীন যদি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে তার হাত গুটিয়ে নেয়, তবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা মাঝপথেই থমকে যেতে পারে। ফলে এই মহাসংকট মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কোনো প্রকার আবেগ বা সাময়িক বাণিজ্যিক সুবিধার মোহে না পড়ে, জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।