বিএডিসির মিশ্র বীজে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ: হাওরজুড়ে হাহাকার

অনলাইন ডেস্ক
১৫ মে ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

জাতীয়

বিএডিসির মিশ্র বীজে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ: হাওরজুড়ে হাহাকার

​প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ 

​একই জমি, অথচ দৃশ্যপট ভিন্ন। কোথাও ধানের শীষ সোনালি রঙ ধারণ করে নুয়ে পড়েছে, কোথাও কেবল দুধভরা কাঁচা শীষ বাতাসের দোলায় দুলছে, আবার কোনো গাছে এখনও শীষই বের হয়নি। একই গোছার ধানে প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরবরাহ করা বীজে দুই জাতের ধানের মিশ্রণ কেড়ে নিয়েছে হাজারো কৃষকের সারা বছরের অন্ন।

​বিশ্বাসের মাশুল যখন ‘সর্বনাশ’

​হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল। এই ঝুঁকি এড়াতে তারা আগাম জাতের ধান চাষ করেন। এবার কৃষি বিভাগ ও বিএডিসির পরামর্শে কৃষকরা চড়া দামে ‘ভিত্তি বীজ’ হিসেবে কিনেছিলেন ব্রি ধান-৮৮। প্রতিশ্রুতি ছিল, ১৪০-১৪৫ দিনের মধ্যে এই ধান পেকে যাবে, ফলে ঢল নামার আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

​কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের কৃষক হাবিবুর রহমান ১৩ কানি জমিতে এই ধান বুনেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "সরকারি বীজ দেইখ্যা বিশ্বাস কইরা কিনছিলাম। অহন দেহি এক ক্ষেতে তিন পদের ধান। কুনুডা পাকছে, কুনুডা কাঁচা। পাকা ধান কাটতে গেলে কাঁচাডায় লোকসান, আবার কাঁচাডা পাকার আশায় থাহন যায় না—উজান থেইক্যা পানি আইসা সব তলাইয়া দিছে।"

​নেপথ্যে চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি কেন্দ্রের গাফিলতি

​তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সারা দেশে সরবরাহ করা ব্রি-৮৮ জাতের বীজের সাথে অনিচ্ছাকৃত বা অবহেলাবশত মিশে গিয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি ব্রি ধান-৯২। এই সংমিশ্রণটি ঘটেছে চুয়াডাঙ্গার বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে।

​বিএডিসির গবেষণা সেলের যুগ্ম পরিচালক ড. মো. নাজমুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, "অন্তত ১০০ টন বীজে এই মিশ্রণ ঘটেছে। আমরা উৎস খুঁজে পেয়েছি এবং চুয়াডাঙ্গা কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।" তবে কর্মকর্তাদের শাস্তিতে কৃষকের শূন্য গোলা ভরছে না।

​পাকা ধান ঝরছে, কাঁচা ধান ডুবছে

​সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার চিত্র আরও ভয়াবহ। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ১৮ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে অন্তত ৫ হাজার হেক্টরে এই মিশ্র বীজের বিপর্যয় ঘটেছে।

​কৃষক মঞ্জুরুল হক জানান, একই গোছায় তিন রকমের ধান থাকায় শ্রমিকরা ধান কাটতে রাজি হচ্ছে না। ব্রি-৮৮ যখন পেকে ঝরতে শুরু করেছে, ব্রি-৯২ তখন কেবল পাকতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই গত সপ্তাহের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে মাইলের পর মাইল ফসল। পাকা ধান ঝরে পানির নিচে চলে গেছে, আর কাঁচা ধান পাকার আগেই পচে নষ্ট হচ্ছে।

​সারা দেশে একই ক্ষত

​শুধু হাওর নয়, বীজের এই ‘বিষ’ ছড়িয়েছে রাজশাহী ও মেহেরপুরেও। রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষি মোর্শেদ আলী জানান, গত বছর ফলন ভালো দেখে এবার অনেক আশা নিয়ে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু মিশ্র বীজের কারণে তাঁর ৩৩ হাজার টাকার বিনিয়োগ এখন পানিবন্দি। মেহেরপুরের গাংনীতে সরকারি প্রণোদনার বীজেও একই ভেজাল ধরা পড়েছে।

​কৃষি প্রদর্শনীরও করুণ দশা

​সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজস্ব ‘সিড ভিলেজ’ প্রদর্শনী প্লটগুলোও এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়নি। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের ওমর সিদ্দিক ১৫ বিঘা জমিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রদর্শনী ক্ষেত করেছিলেন। সেই ক্ষেতেও দেখা গেছে একই গাফিলতির ছাপ। মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এমন বীজের মিশ্রণ তারা আগে কখনো দেখেননি।

​এক নজরে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:

​আক্রান্ত জাত: ব্রি ধান-৮৮ (মিশ্রিত হয়েছে ব্রি-৯২)।বীজের পরিমাণ: প্রায় ১ লাখ কেজি বা ১০০ টন।সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা: কিশোরগঞ্জ (১০ হাজার হেক্টর) ও সুনামগঞ্জ (৫ হাজার হেক্টর)।

​মূল কারণ: চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে বীজের সংমিশ্রণ।

​হাওরের কৃষক ননীগোপাল চন্দ্র সরকারের কান্নাভেজা কণ্ঠই যেন এখন ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষকের প্রতিধ্বনি— "আর দুইটা দিন সময় পাইলে সব কাইট্টা নিয়া যাইতাম। কিন্তু বিএডিসির বীজে আমাগো কপাল পুড়ল, আর উজানের পানিতে সব তলাইল।" সরকারি বীজের ওপর কৃষকের এই আস্থার সংকট ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।