গোলাপ ফুল চাষে পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনা
সৌন্দর্য্যে ও লাবণ্যের প্রতীক গোলাপ একটি শীতকালীন মৌসুমি ফুল। তবে বর্তমানে গোলাপ সারা বছর ধরেই চাষ করা হচ্ছে। গোলাপ গাছের পুরনো ডাল বেশি দিন ফুল দিতে চায় না। প্রতি বছরই গাছের গোড়া থেকে বা পুরনো ডাল থেকে নতুন ডাল বের হয়। গাছের অঙ্গ ছাঁটাই করে এসব নতুন ডালকে সুষ্ঠুমতো বাড়তে দিতে হয়। ফুলের মৌসুমের আগেই অর্থাৎ অক্টোবর মাসেই অঙ্গ ছাঁটাই করার ভাল সময়। ফুলের আকার বড় করতে, নতুন শাখাকে ভাল করে বিস্তৃত করতে সাহায্য করার জন্য এবং ক্ষত ও রোগাক্রান্ত ডাল কেটে বাদ দেবার জন্য অঙ্গ ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন। ধারালো সিকেচার বা বিশেষ এক প্রকার ছুরি দিয়ে অঙ্গ ছাঁটাই করতে হয়। ডাল কাটার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন থেঁতলে না যায়। এতে গাছে ছত্রাক রোগের আক্রমণ হতে পারে। যেসব উল্লেখযোগ্য পোকা-মাকড় গোলাপ গাছকে আক্রমণ করে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-
উইপোকা
কাটিং লাগাবার পর নতুন শিকড় বের হবার আগেই পুরান শিকড়গুলোকে নষ্ট করে দেয়।
দমন ব্যবস্থা : মাটিতে উই পোকা থাকার সম্ভাবনা থাকলে ক্লোরো পাইরিফস গ্রুপের ডার্সবার্ন ২-৩ মিলি. ১ লিটার পানিতে বা উপযুক্ত কীটনাশক দিয়ে মাটি শোধন করে নিলে উইপোকার আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।
লাল ক্ষুদে মাকড়সা
এ পোকা পাতার নিচের পিঠে থেকে পাতার রস চুষে খায় বলে গাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পাতার উপরের পিঠে পিন ফোটানো দাগ এবং আক্রান্ত পাতা ও ডালে সূক্ষ্ম জাল দেখা গেলে এদের আক্রমণ শনাক্ত করা যায়। আক্রমণ বেশি হলে সবুজ রং হালকা হয়ে যায় এবং পাতা কুঁকড়িয়ে যায়। অনেক সময় গাছ মারাও যায়।
দমন ব্যবস্থা : সংখ্যায় কম থাকতেই লাল ক্ষুদে মাকড়সা দমন করতে হয়, নতুবা পরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কেলখেন-৪২, থিওভিট-৮০, ইথিওন-৪৬.৫ ইসি প্রভৃতি কীটনাশকের যে কোন একটি পানির সংগে নির্দিষ্ট পরিমাণ মিশিয়ে পাতার উল্টো পিঠে স্প্রে করে এদের দমন করতে হয়। শুধুমাত্র ঠাণ্ডা পানি জোরে স্প্রে করেও এদের দমন করা যায়।
শ্যাফার বিটল
এ পোকা বড় ও লালচে রঙের। রাতের বেলা গাছের পাতা খেয়ে ঝাঁঝরা করে দেয়, ফুলের পাপড়ি ও রেণু খায় এবং চারা গাছের বৃদ্ধিতে বিশেষ ক্ষতি করে। বর্ষাকালেই এ পোকার আক্রমণ বেশি হয়। এ পোকা মাটিতে ডিম পাড়ে এবং ক্রীড়া গোলাপের শিকড় খেয়ে ক্ষতি করে।
দমন ব্যবস্থা : পাইরিফস, পাইরিবান বা উপযুক্ত কীটনাশক দিয়ে মাটি শোধন করলে কীড়া মারা যায়। রাতের বেলা হাতে বেছে পোকা ধরে মেরেও এ পোকা দমন করা যায়। এ ছাড়াও ম্যালাথিয়ন, ক্লোরোপাইরিফস, ডাইফ্লুথ্রিন, অ্যাসিফেট, বাইফেনথ্রিন, ইমিডাক্লোরোপিড ব্যবহার করা যেতে পারে।
গুঁয়ো পোকা (কুড়িছিদ্রকারী পোকা)
এরা গাছের পাতা খেয়ে ক্ষতি করে।
দমন ব্যবস্থা : পোকা অল্প ও বড় আকারের হলে ধরে মেরে ফেলা সহজ। কিন্তু আকারে ছোট ও সংখ্যায় বেশি হলে রিপকর্ড ১০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১.১ মিলি বা যেকোন স্পর্শ বিষ স্প্রে করতে হয়। একবারে দমন না হলে ২-৩ দিন পর আবার স্প্রে করার সময় আশেপাশের গাছ ও ঘাসে স্প্রে করতে হয়।
ডিপার বোলতা
ভাটইরের পর অনেক সময় এরা আলের কাটা অংশ দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ভেতরে গিয়ে বাসা বাঁধে। এই কত দিয়ে গাছ ছত্রাক প্রদা আক্রান্ত হয় এবং পরে ডাইব্যাক রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।
দমন ব্যবস্থা : ডাল ছাঁটাইয়ের পর কাঁটা আংশে প্রুনিং পেইন্ট লাগিয়ে এ পোকা প্রতিরোধ করা যায়।
স্কেলপোকা
গাছের পুরনো ডালের ছালের ওপর অনেক সময় বাদামি রঙের স্কেল পোকার আক্রমণ হয়। এদের ওপর শক্ত স্কেল বা আঁশ থাকে। এ পোকার কীড়া নতুন স্থায়ীভাবে বসে রস চুষে খেয়ে গাছকে নিস্তেজ করে দেয়।
দমন ব্যবস্থা : চৈত্রের দিকে যখন কীড়া দেখা দেয় তখন এবং ছাঁটাইয়ের পর কীটনাশক স্প্রে করলে এ পোকা দমন হয়। গাছের সংখ্যা কম হলে মেথিলেটেড স্পিরিটে ব্রাশ ডুবিয়ে আক্রান্ত ডাল ঘষে দিলে পোকা উঠে যায়। আক্রান্ত ডাল ছাঁটাই করে পুড়িয়ে দিলেও এ পোকার বিস্তার কমে।
থ্রিপস
মার্চ হতে এপ্রিল পর্যন্ত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় থ্রিপসের আক্রমণ হয়। এরা ঝাঁক ধরে এসে আক্রমণ করে এবং অল্প সময়েই ফুলের কুঁড়ি ও অপরিণত ডগার রস চুষে খেয়ে গাছের বিশেষ ক্ষতি করে। ফলে ফুল কুঁচকানো অবস্থায় ফোটে বা ফুটতেই পারে না। কচি ডগার পাতা কুঁকড়ে যায়। আক্রান্ত ডগা ও ফুল পরীক্ষা করলে পরিণত ও অপরিণত থ্রিপস দেখা যায়।
দমন ব্যবস্থা : আক্রান্ত ডগা এবং ফুল কেটে পুড়িয়ে ফেলে এবং মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি অথবা ইমিডাক্লোরাপিড নামক কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২.০ গ্রাম হারে পানিতে মিশিয়ে সপ্তাহে একবার করে ২-৩ বার পরে দু সপ্তাহ পর একবার করে নিয়মিত স্প্রে করতে হয়। সপসিন, তামাকের গুঁড়া (১০ গ্রাম), সাবানের গুড়া (৫ গ্রাম) নিমের নির্যাস অথবা গেইন ২০ SL 0.25 ml/L (S : কৃষি বাতায়ন) মিশিয়ে ১০-১২ দিন পরপর ২-৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
জাবপোকা
জাবপোকা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে পাতা, কচি ডগা ও ফুলের রস চুষে খেয়ে ক্ষতি করে।
দমন ব্যবস্থা : এ পোকা দমনের জন্য ২ মিলি. লিটার ম্যালাথিয়ন অথবা সুমিথিয়ন প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।
রোগ
গোলাপ গাছে ছত্রাকজনিত ও খাদ্যের অভাবজনিত রোগ দেখা যায়। ছত্রাকজনিত রোগ ও প্রতিকার নিম্নরূপ :
ডাইব্যাক
রোগাক্রান্ত গাছের ডাল বা কাণ্ড মাথা থেকে কালো হয়ে মরতে শুরু করে। এ লক্ষণ ক্রমেই কাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে এবং সম্পূর্ণ গাছ মারা যায়।
দমনব্যবস্থা : ডাইব্যাক শুরু হলে রোগাক্রান্ত বেশ নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে দিয়ে কাটা মাথায় প্রুনিং পেইন্ট লাগিয়ে দিতে হয়, আক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে দিতে হয় এবং যে সিকেটিয়ার বা ছুরি দিয়ে আক্রান্ত গাছ কাটা হয় তা স্পিরিট দিয়ে মুছে দিয়ে অন্য গাছ কাটতে হয়। কর্তিত অংশ বোর্দোপেস্ট বা কপার অক্সিক্লোরাইড যেমন-কুপ্রাভিট ৯ gm/L এবং নতুন লতা বের হলে বেভিস্টিন ১ gm/L ৭-১০ দিন পরপর ৩ বার (S : কৃষি বাতায়ন)
পাউডারি মিলডিউ
শীতের শেষের দিকে পাতায় সাদা সাদা পাউডারের মতো দেখা যায়। এগুলো ছত্রাকের অণুজীব। রোগ বেশি হলে আক্রান্ত গাছের কচি পাতা ও ডগা এসব অণুজীব দ্বারা একেবারে ঢেকে যায়। কুঁড়ি ফোটে না, নষ্ট হয়ে যায়।
দমন ব্যবস্থা : রোগাক্রান্ত ডগা ও পাতা তুলে পুড়িয়ে দিতে হবে এবং হেক্সাকোনাজল ৫ ইসি বা ডাইথেন এম-৪৫ অথবা ইন্ডোফিল এম-৪৫ দিয়ে স্প্রে করতে হবে।
ফুল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা
সদ্য ব্যবহারের জন্য আধফোটা গোলাপ ফুলের কুঁড়ি কাটা উচিত। কিন্তু কয়েক দিন পর ব্যবহারের লক্ষ্যে গোলাপ ফুলের কুঁড়ির পর্যায়ে আসার পর কাটা উচিত। কাটা ফ্লাওয়ার হিসাবে ফুল লম্বা পুষ্পদণ্ড কয়েকটি পাতাসহ ধারালো ছুরি দিয়ে কাটতে হয়। ফুল কাটার কাজটি খুব সকালে অথবা শেষ বিকেলে করা উচিত। ফুলদানীর পানিতে ৩% চিনি ও ৬০০ পিপি এম ৮- HQC এর দ্রবণে ফুল রেখে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাজারের চাহিদার ওপর ফুলের প্যাকেজিং নির্ভরশীল। অনেক উৎপাদনকারী নিকটস্থ স্থানীয় বাজারের জন্য প্যাকেজিং ছাড়াই ফুলের আঁটি বা গোছা বাজারে সরবরাহ করে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আঁটিগুলো খবরের কাগজ দ্বারা আবৃত থাকে।
ফলন
গোলাপের ফলন প্রধানত আবহাওয়া ও জাতের উপর নির্ভরশীল। আদর্শ উৎপাদন পরিবেশে লম্বা কাণ্ডযুক্ত জাত প্রতি বছর গাছপ্রতি প্রায় ১৫ থেকে ৩০টি ফুল উৎপন্ন করে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিশেষ করে যখন ফুলের মান এবং বাজার দর কমে যায়, তখন কুঁড়ি ছাঁটাই করে গাছের দৈহিক গঠন ও বৃদ্ধি ঠিক রাখতে হয়।